২৪শে সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রিস্টাব্দ / ৯ই আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ / ১৬ই সফর ১৪৪৩ হিজরি / আজ শুক্রবার এখন সময় দুপুর ১:০৭মিনিট / এখন শরৎকাল

Category: সাহিত্য

হাটহাজারীতে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর জীবনের শেষ তিনদিন

হাটহাজারীতে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর জীবনের শেষ তিনদিন

201 জন দেখেছেন

হাটহাজারী মাদরাসার খেদমতে নিবেদিত শাহ আহমদ শফীর জীবনের শেষদৃশ্য ছিল বড় করুণ। ওই অন্তিম শেষ তিন দিনে তাঁর পাশে ছিলেন নাতি মাওলানা আরশাদ এবং একান্ত খাদেম হাজোইফা আহমদ। তাদের নিজ জবানিতে তারা বর্ণনা করেছেন ওই বিক্ষুব্ধ সময়ের পূর্ণ চিত্র। আসলে কী ঘটেছিল তখন? ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, আহমদ শফী সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিলেন। ছেলে আনাস মাদানী ঢাকায় ছিলেন। জোহরের নামাজের পর মাঠে হৈ চৈ এর আওয়াজ শুনতে পেয়ে একজন শিক্ষক হজরতের কামরায় এসে খবর দেন, ছাত্ররা মাঠে চিৎকার করছে, আনাস মাদানীর বহিস্কারের দাবি জানাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর খবর আসে, আনাস মাদানীর কক্ষের দরজা-জানালা ভেঙে লুটপাট করছে সন্ত্রাসীরা। আন্দোলনকারী সন্ত্রাসীরা হাটহাজারী মাদরাসার শেখ আহমদ সাহেবের কক্ষের দরজা ভেঙ্গে মুহতামিম সাহেবের কামরায় আসতে বাধ্য করে। উগ্রপন্থীদের আগমনঃ শেখ আহমদ সাহেবের সঙ্গে উগ্রপন্থী নেতা হাসানুজ্জামানের নেতৃত্বে পাঁচজনের একটি দল মুহতামিম কার্যালয়ে প্রবেশ করেই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে এবং মাদানীকে বহিষ্কার করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। তখন হুজুর বলেন, ‘আনাসের যেসব দোষ রয়েছে, তা লিখিত আকারে অভিযাগ করে জানাও, আমি দস্তখত দিব। দলের সদস্যরা প্রমাণসহ সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ উপস্থাপন করতে না পারায় আহমদ শফী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। উগ্রপন্থীদের ২০/২৫ জনের আরেকটি দল আন্দোলনকারী নেতা শহিদুল্লাহর নেতৃত্বে প্রথম দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারে যে, মুহতামিম সাহেব তাদের ভিত্তিহীন দাবি মানতে পারছেন না। এ সময় কার্যালয়ের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছাত্রদের হুমকিধমকি ও জোর জবরদস্তি করে দরজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ছাত্র আন্দোলনকারী নামধারী কিছু সন্ত্রাসী। মাওলানা নুরুল ইসলাম (কক্সবাজার), মুফতী উসমান, আনাস মাদানী ও দিদার কাসেমীর কামরা ভাংচুর করে রশিদ বইসহ লক্ষ লক্ষ টাকা লুট করে। বিক্ষোভকারীরা বিশ-পঁচিশজনের একটি শুরা কমিটি গঠন করে প্রত্যেকের নেতৃত্বে আন্দোলনকারী ৪০/৫০ জনের একেকটি দল গঠন করা হয়। এই দলের যত ব্যয় হত সব তারা উস্তাদদের কামরায় লুটপাট করা অর্থের মাধ্যমে বহন করত! শুরার বৈঠক অনুষ্ঠিতঃ মাগরিবের পর হাটহাজারী মাদরাসার শুরা সদস্য নোমান ফয়েজী, সালাহউদ্দীন সাহেব এবং ওমর ফারুক সাহেব সহ মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষক শুরার বৈঠক করেন। বৈঠকে নোমান ফয়েজী ও উগ্রপন্থীরা আনাস মাদানীকে বহিষ্কার করার চাপ দিচ্ছিলেন। হজরত বহিষ্কার করতে রাজি না হওয়ায় কার্যালয়ের ভেতরে টেবিলের গ্লাস, বাইরের সীমানা গ্লাস এবং ফুলের টবগুলো ভাংচুর করে আন্দোলনকারীরা। তারা হজরতের সামনে জামেয়ার অফিশিয়াল একটি প্যাড রেখে নাতি দেওবন্দ পড়ুয়া আসাদের গলায় গ্লাসের টুকরো ধরে দস্তখত করতে বলে। হজরতের সামনে ব্যক্তিগত সহকারী (খাদেম) মাওলানা শফিউল আলমকে রড দিয়ে আঘাত করা হচ্ছিল এবং চড়-ঘুষি মারা হচ্ছিল। হুজুরকে সরকারের দালাল, মুনাফিক সহ গালিগালাজ করছিল তার খাদেম আর উপস্থিত আলেমদের সামনেই। একপর্যায়ে সক্ষম হয় তারা, তবে স্বাক্ষরটি স্বাক্ষর না, সেটা দেখলেই বুঝা যায়। এরপর তারা মাদ্রাসার মাঠে গিয়ে মাইকে ‘হুজুর আনাস মাদানীকে বহিস্কার করেছেন’ আগামী শনিবার শুরার সভায় বাকি বিষয়ে সমাধান হবে বলে ঘোষণা দেয়, পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ বৃহস্পতিবারঃ পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত ছিল। সন্ত্রাসীরা এই সাধারণ বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানাভাবে গুজব প্রচার করতে থাকে “শফী সাহেব মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়ার মিটিং ডেকেছেন”, তিনি গতকালকের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। এরপর মাদরাসার পাগলা ঘণ্টা বাজানো হয়। আন্দোলনকারীরা হজরতের কার্যালয়ে এসে উপস্থিত শিক্ষকদের বের হয়ে যেতে বলে। উনারা চলে যাওয়ার পর আহমদ শফীর কার্যালয়ের বিদ্যৎ সরবরাহ বন্ধ করে শুরু করে ভাংচুর ও লুটতরাজ। কোনো অজুহাত ছাড়া হজরতের সামনে তাঁর খাদেমদের বেধড়ক মারধর করা হয়। হজরতের অক্সিজেন সাপোর্ট খুলে ফেলে। বিদ্যুতের কারণে এসি বন্ধ এবং অক্সিজেন খুলে ফেলায় হুজুরের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। অনেক আকুতি মিনতির পর বিদ্যুৎ সংযোগ ও অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে তারা রাজি হয়। অক্সিজেন ও নেবুলাইজারের মাধ্যমে হজরতকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে আহত খাদেমরা। নাতি আরশাদকে জিম্মিঃ তারা হুজুরের নাতি আশরাদকে জিম্মি করে বলে, ‘আপনাকে মসজিদের মাইকে বলতে হবে যে, হুজুর সুস্থ আছেন, হামলা হয়নি। এ মর্মে ভিডিওবার্তাও দিতে বলে। তারা দুই পৃষ্ঠার একটি ঘোষণা লিখে নিয়ে আসে। খাদেম শফিকে মেরে বাধ্য করা হয় ভিডিওবার্তা দেওয়ার জন্য। নাতি আসাদকে হজরতের সামনে থেকে টেনে হিঁচড়ে এনে নির্মম নির্যাতন করা হয়। হজরত তখন অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিলেন আর চোখ বেয়ে অঝাোরে পানি পড়ছিল। তারা ওয়েটিং রুমের চারটি দুই টনি এসি, দুটি টি টেবিল ছাড়া সব টেবিল, প্লেট-গ্লাস সহ যাবতীয় আসবাবপত্র ভেঙে ফেলে। হজরতের যত সম্মাননা পদক ছিল আধিকাংশ পদক নষ্ট করে ফেলে। এমন কি হারামাইন কর্তৃক উপহার দেয়া কাবাঘরের বাঁধাই করা গিলাফও ভেঙে চুরমার করে ফেলে। কামরার বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে ফেলে। হুজুরের কামরার আইপিএস- এর যে ব্যাটারি ছিল সেগুলো নষ্ট করে ফেলে। মূলত যে সকল শিক্ষকের কামরা থেকে তারা টাকা-পয়সা লুটপাট করেছিল তার অধিকাংশই তাদের ব্যক্তিগত বা বিভিন্ন মসজিদ-মাদরাসায় প্রদান করা অন্যের আমানতের টাকা। যেমন: মাওলানা উমর সাহেবের রুমে তার মেয়ে ও স্ত্রীর ২০ভরি স্বর্ণ, হুজুরের নিজের এবং মানুষের আমানত ৪০ লাখ টাকা তারা লুট করে (যদিও পরে পাঁচ ভরি স্বর্ণ ফিরিয়ে দেয়)। মাওলানা নুরুল ইসলাম (কক্সবাজার) হুজুরের রুমে তিন জুমার কালেকশন ও ব্যক্তিগত টাকা মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ টাকা, মুফতি উসমান সাহেবের রুম থেকে দুই মাসের বেতনসহ মোট ৬০ হাজার টাকা, দিদার সাহেবের কামরা থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং আনাস সাহেবের রুম থেকে ২৮ লাখ টাকা তারা লুট করে। আবারো শুরার বৈঠক : হুজুরের অবস্থা শংকটাপন্নঃ মাগরিবের পর সন্ত্রাসীরা শুরা সদস্যদের ডেকে বৈঠকের ব্যবস্থা করে। শুরা সদস্যরা হুজুরের কামরায় আসতে থাকেন। আমির আহমদ শফী, মুহিব্দুল্লাহ বাবুনগরী ও ২০০৪ সালে সর্বসম্মতিক্রম শুরার যে সকল সদস্যকে বহিষ্কার করেছিলেন, সেই সমস্ত বহিস্কৃত সদস্যগণও উপস্থিত হন।…

© ২০২০ | আজকের নওগাঁ কর্তৃক সর্বসত্ব ® সংরক্ষিত

Developed By: Rezaul24